Feedjit Live

This is default featured post 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured post 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

Showing posts with label অর্থলোভী. Show all posts
Showing posts with label অর্থলোভী. Show all posts

Sunday, August 7, 2011

বনে বিরল তবে বাজারে বিকায়

ঢাকার কাপ্তানবাজারের পাখির দোকানে বিরল পাখি ধনেশ বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে ।


চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজারের মূল ফটক দিয়ে কিছুদূর এগোলেই ডান দিকে ‘পাখির গলি’। গলির মুখেই রমজান চাচার দোকান। সেখানে সম্প্রতি একদিন গিয়ে দেখা গেল, চারটি খাঁচায় দুটি কাক, ছয়টি কবুতর ও তিনটি খরগোশ রাখা। নির্ভেজাল পোষা পশুপাখির কারবার। 
কিন্তু রমজান চাচার কাছে ‘নতুন পশুপাখি কী আছে?’ জিজ্ঞেস করতেই জানা গেল ‘আসল জিনিসের’ খবর। ক্রেতা ঠাউরে চাচার জবাব, ‘কী লাগবো কন। ভালুকের পিত্ত (গলব্লাডার) দেওয়া যাইবো ১০টা। দাম ৩০ হাজার টাকা কইরা। তাজা অজগর এক লাখ। দুই মাস টাইম দিলে বেঙ্গল বাঘের চামড়াও আইনা দিমু।’
রমজান চাচা আরও জানান, অজগর ও মেছোবাঘের চামড়াও দিতে পারবেন তিনি। পাঁচ হাজার টাকায় মিলবে জ্যান্ত কেউটে বা শঙ্খিনী সাপ।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এভাবেই অবৈধভাবে বাজারে ঠাঁই পাচ্ছে অনেক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী। চোরা শিকারিদের হাত ঘুরে তাদের জায়গা হচ্ছে খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন তথাকথিত ‘পাখির বাজারে’। দেশের গুরুতর ঝুঁকির মুখে থাকা জীববৈচিত্র্য ক্রমেই বিপন্নতর হচ্ছে। 

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা থেকে উদ্ধার করা বাঘের চামড়া, হাড় ও চারটি মাথা।
কবুতর-খরগোশ ও বাহারি পাখির আড়ালে বিক্রি হচ্ছে বিপন্ন বাঘ, ভালুুক, উল্লুক, হনুমান এবং ধনেশ ও মদনটাকের মতো বিরল পাখি। অভ্যন্তরীণ চোরাবাজার থাকার পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ বন্য প্রাণী পাচারেরও অন্যতম নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। বন্য প্রাণী ব্যবসার ওপর নজরদারি করা আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ট্রাফিক’-এর ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে ৩০০ কোটি টাকার অবৈধ বন্য প্রাণীর ব্যবসা হয়ে থাকে।
রাজধানীর কাঁটাবনে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপণি কেন্দ্রটির পোষা পশুপাখির দোকানের অনেকগুলোতেই অবৈধভাবে বন্য প্রাণী বিক্রি হয়ে থাকে। সেখানে রংবেরঙের পোষা পাখি, খরগোশ ও কুকুরের পাশাপাশি প্রায়ই ঈগল ও কালিমসহ বিভিন্ন পাখি এবং ছোটখাটো বন্য প্রাণী এক রকম প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়। সম্প্রতি এক দিন গিয়ে চুপিচুপি অজগর ও কুমির আছে কি না জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন দোকানি টেলিফোন নম্বর দিয়ে জানালেন, কী লাগবে তা ওই ফোনে জানাতে। মাঝেমধ্যে কর্তৃপক্ষের অভিযানের পরও এ বাজারে বছরের পর বছর ধরে বন্য প্রাণীর ব্যবসা চলছে। 
রাজধানীর কাপ্তানবাজারের মুরগিপট্টির বিপরীতে নতুন গড়ে ওঠা পাখির দোকানগুলোতে তেমন রাখঢাক ছাড়াই বন্য প্রাণীর ব্যবসা চলে। ‘বিসমিল্লাহ বার্ডস’ নামের দোকানে গিয়ে বন্য প্রাণী কিনতে চাইলে দোকানি ক্যাটালগ বের করে বললেন, ‘কোনটা লাগবো, অরজিনাল জঙ্গল থিক্যা আনা।’ 
এখানকার আরেক দোকান ‘বার্ডস হাউস’-এ পাওয়া গেল হাওরের বিরল চারটি কালিম পাখি। এর পরের খাঁচায়ই দেশে বিলুপ্তপ্রায় পাখি বিশাল ঠোঁটের ধনেশ। দোকানি ইমরান জানালেন, প্রতিটি ধনেশ ৩০ হাজার টাকা। ১২টি দেওয়া যাবে। সুন্দরবন থেকে আনা ছয়টি মদনটাক পাখি গুদামে আছে। এ পাখিটিও অতিবিপন্ন। 
টঙ্গী ব্রিজের শেষ মাথায় রোববারে বসে বিশাল কবুতরের হাট। ২০০ থেকে ৩০০ দোকান বসে এই হাটে। সপ্তাহ দুয়েক আগের এক রোববারে সেখানে গিয়ে দেখা যায় নানা প্রজাতির কবুতরের সঙ্গে ঘুঘু, কালিম ও বেজি বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ বিক্রেতাই টিয়া, ময়না, বক, কোকিলসহ নানা জাতের বন্য পাখি নিয়ে বসেছেন। বিকেলে নৌপথে এখানে অজগরসহ নানা প্রজাতির সাপ আনা হয় বলে জানালেন কয়েকজন বিক্রেতা।
উত্তর-পূর্বের জেলা নেত্রকোনার ভারত-সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দায়ও বসে বনবিড়াল, গন্ধগোকুল, লামচিতা, সাপসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণীর হাট।
কোথা থেকে কোথায় যায়: অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরা শিকারিরা সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বন্যপ্রাণী ধরে বাজারে চালান দেয়। ভারতীয় সীমান্ত দিয়েও চোরাপথে আসে বেশ কিছু বন্য প্রাণী। চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও মিয়ানমার সীমান্ত পথে অনেক বন্য প্রাণী বাইরেও পাচার হচ্ছে। থাইল্যান্ড, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ এগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাধিক পোষা পশুপাখির ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, দেশের দুই প্রধান দলের দুজন সাবেক সাংসদ এ ব্যবসার অন্যতম ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী বর্তমান সাংসদ তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বন্য প্রাণী পাচার করে থাকেন বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

ভালুকের পিত্ত হাতে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানি রমজান
বাঘ-হাঙরের চামড়া পাচার: ‘প্রজেক্ট অন টাইগার’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে দুই থেকে তিনটি বাঘ চোরা শিকারিদের হাতে মারা পড়ে। এ ছাড়া কমপক্ষে দুটি বাঘ মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায়। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশের (ডব্লিউটিবি) হিসাবে শিকারিদের হাতে বছরে ১০ হাজার হরিণ মারা পড়ছে। দেশে মাঝেমধ্যেই বাঘের চামড়া বা দেহাবশেষ আটকের ঘটনা ঘটে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলায় বেঙ্গল টাইগারের তিনটি চামড়া, চারটি খুলি ও ৩০ কেজি হাড়সহ একজন ধরা পড়ে। ৬ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের থানচির জঙ্গল থেকে বেঙ্গল টাইগার মেরে এর চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেয় স্থানীয় বম জাতিগোষ্ঠীর কিছু মানুষ।
নদী ও সাগর থেকেও হাঙর, কুমির, ঘড়িয়াল ও কচ্ছপ দেদার ফাঁদ ও বিভিন্ন কায়দায় ধরা হচ্ছে। দেশের ১২টি প্রতিষ্ঠান ‘বৈধ’ অনুমোদন নিয়ে রপ্তানি করছে হাঙর, শাপলাপাতা মাছ (স্টিংরে) ও কচ্ছপের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। আর অবৈধ পথে যাচ্ছে সাপ, কুমির ও অতিবিরল ঘড়িয়াল। বিরল পাখিও আছে পাচারের তালিকায়। বাঘ ও ভাল্লুকের চামড়া ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ওষুধ, গহনা ও গৃহসজ্জাসামগ্রী তৈরিতে ব্যবহূত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেঙ্গল টাইগারের চামড়ার দাম ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। মেছোবাঘ ও লামচিতার চামড়া মিলবে ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। জ্যান্ত মেছোবাঘ বা লামচিতা এক থেকে দুই লাখ টাকায় পাওয়া যাবে বলে জানান একজন ব্যবসায়ী। তিনি জানান, জ্যান্ত ভালুক, উল্লুক ও হনুমানও মোটা দামে বিক্রি হচ্ছে। 
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বনে বাঘ, সমুদ্রে হাঙর ও নদীতে কুমির প্রাণচক্রের সর্বোচ্চ স্থানে থাকা প্রাণী। এরা অন্য প্রাণীদের খেয়ে বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখে। এদের এ হারে মেরে ফেলতে থাকলে একসময় বন-জলাভূমির প্রাণচক্র ভেঙে পড়বে। বন্য প্রাণী একবার বিলুপ্ত হয়ে গেলে তাদের আর ফিরে পাওয়া যাবে না।’
দেশের একমাত্র বৈধ কুমিরের খামার রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেছেন, পরিচয় গোপন করে অনেকে তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক বাজারের তিনগুণ বেশি দামে কুমির কেনার প্রস্তাব দিচ্ছে। বিনিময়ে কুমিরের চালানের সঙ্গে অন্য বন্য প্রাণীও পাচারের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
বায়ো-কেমিক্যাল অ্যান্ড সি ফুড এক্সপোর্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজহারুল ইসলাম জানান, গত অর্থবছরে তাঁর প্রতিষ্ঠানসহ ১২ জন মিলে মোট প্রায় ৬০ কোটি টাকার হাঙরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কচ্ছপের খোল ও মাংস এবং শাপলাপাতা মাছ রপ্তানি করেছেন। 
চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক বিভাগের কমিশনার জামাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাঙর নিষিদ্ধ হলে তা রপ্তানি হওয়ার কথা না। তবে বিষয়টি আমার জানা নেই।’ 
বিপন্ন বিরল প্রাণী ভালুক: ভালুকের পিত্ত বিক্রির সবচেয়ে বড় বাজার চট্টগ্রাম। এ দিয়ে তৈরি হয় ওষুধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ভালুকের পিত্ত সরবরাহ হয়ে থাকে। ওই অঞ্চলের চোরা শিকারিরা ফাঁদ পেতে ভালুক ধরে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পাশাপাশি জ্যান্ত প্রাণীটিও বিক্রি হয়ে থাকে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়মিতভাবে জীবিত ভালুক ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয়ে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ানের মানুষ এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ১৯৯১ সালের ১৯ জুন চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে অপেক্ষমাণ কোরীয় জাহাজ ‘সিইয়াং’-এ অভিযান চালিয়ে বন বিভাগ ছয়টি জীবিত ভালুক ও ২৪টি বানর উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলো চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় দেওয়া হয়। ওই জাহাজের মালিকদের জরিমানা করা হয়েছিল। 
বিশেষজ্ঞের উদ্বেগ: পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) তালিকায় অতিবিপন্ন প্রাণী হিসেবে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার (সুন্দরবনের বাঘ), মেছোবাঘ, লামচিতা ও কালো ভালুকের নাম। বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে গন্ডার, জলার কুমির, হায়েনা, নেকড়েসহ মোট ১৫ প্রজাতির বন্য প্রাণী। 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনিরুল আলম খান এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঘ-ভালুকের সংখ্যাও দিন দিন কমে আসছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশ থেকে বন্য প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’
অধ্যাপক মনিরুল আলম খান বন্দরগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বন্য প্রাণী চিহ্নিত করা ও পাচার রোধে সচেতন করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন। তাঁর মতে, একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে সক্রিয় করতে হবে।
প্রধান বন্য প্রাণী সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বন্য প্রাণী রক্ষায় আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা না পেলে এই অনৈতিক ও অবৈধ ব্যবসা থামানো যাবে না।’ কাঁটাবন মার্কেটে অবৈধ বন্য প্রাণীর ব্যবসার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাজারে কিছুদিন পরপর অভিযান চালিয়ে বন্য প্রাণী পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এটি বন্ধ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

Tuesday, July 26, 2011

বাজারে ফিরে এসেছে চিনি

প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া ব্যবসায়ীদের আশ্বাসের পর বাজারে ফিরে এসেছে চিনি। সরকারের বেঁধে দেওয়া দর ৬৫ টাকায় চিনি বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। তবে কিছু দোকানে এখনো ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে রমজানের নিত্যপণ্যের মধ্যে ছোলা, খেজুর, মুড়ি ও গুড়ের বাজার এখনো চড়া। তবে চাল, ডাল, মটরের (ডাবলি) দাম তেমন একটা বাড়েনি। কয়েক দিন ধরে এ পণ্যগুলোর দাম ব্যবসায়ীরা এতটাই বাড়িয়েছেন যে এখন নতুন করে আর বাড়ানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। তার চেয়ে বর্তমান দামটিই ধরে রাখার কৌশল নিচ্ছেন তাঁরা।
এ ছাড়া এক সপ্তাহের মধ্যে গুঁড়ো দুধের দাম কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। মুরগির দাম কিছু কমেছে। আর গরু ও খাসির মাংসের দর বেঁধে দিলেও এখনো তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।
সরকার-নির্ধারিত দরে চিনি: গত বুধবার চিনির দর বেঁধে দেওয়ার পর বাজার থেকে উধাও ছিল চিনি। সেই চিনির দেখা মিলেছে গতকাল সোমবার। যেসব দোকানে চিনি ছিল, গতকাল সেগুলোয় বিক্রি হয়েছে সরকার-নির্ধারিত ৬৫ টাকা দরে।
সকালে পলাশী বাজারে গিয়ে বেশির ভাগ দোকানে চিনির দেখা মেলে। কয়েকজন দোকানি জানান, পাইকারি বাজার থেকে ঠিকমতো সরবরাহ করায় তাঁরা এখন চিনি আনতে পারছেন। এ কারণে ৬৫ টাকায় বিক্রিও করতে পারছেন।
তবে পলাশী বাজারেরই কয়েকটি দোকানে ৭০ টাকায় চিনি বিক্রি করতে দেখা গেছে। কারণ জানতে চাইলে দোকানিরা জানান, এ কয়দিন ৭০ টাকায় পাইকারি বাজার থেকে চিনি কিনেছেন। এ দামে বিক্রি করেই তাঁদের লোকসান হচ্ছে। ৬৫ টাকায় এ চিনি বিক্রি করা সম্ভব নয়। তবে দু-এক দিনের মধ্যেই ৬৫ টাকায় চিনি বিক্রি করবেন বলে তাঁরা জানান।
হাতিরপুল বাজারের ভেতর ও বাইরে, পূর্ব তেজতুরী বাজার এবং পল্টনের বিভিন্ন দোকানেও ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় চিনি বিক্রি করতে দেখা গেছে।
গতকাল দুপুরে নয়াবাজারের অধিকাংশ দোকানে চিনি পাওয়া যায়নি। তিনটি দোকানে চিনি থাকলেও ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দাম চাওয়া হয়। এক দোকানি এইমাত্র চিনি এসেছে বলে জানান। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, এখন থেকে ৬৫ টাকায় চিনি বিক্রি করবেন।
গত কয়েক দিনের চিনিশূন্য কারওয়ান বাজারের দোকানগুলোতেও গতকাল দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। প্রায় সব দোকানেই চিনি বিক্রি হচ্ছে। দোকানি মাসুদ রানা বলেন, ‘এত দিন বাজারে চিনি ছিল না। আমরা কিনতে গিয়েও পাইনি। গতকাল (রোববার) বাজারে দু-তিন হাজার বস্তা চিনি এসেছে। এ কারণে সব দোকানে এখন চিনি আছে।’
খোলা সয়াবিন এখনো কম: নয়াবাজারের বেশির ভাগ দোকান ঘুরে খোলা সয়াবিন তেলের দেখা মেলেনি। একই অবস্থা পলাশী ও হাতিরপুল বাজারেও। কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১০৯ থেকে ১১৩ টাকা পর্যন্ত। তবে কারওয়ান বাজারে খোলা সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে এবং বিক্রিও হচ্ছে সরকার-নির্ধারিত দাম ১০৯ টাকায়।
খুচরা দোকানগুলোয় বেশি বিক্রি হচ্ছে বোতল ও প্যাকেটজাত তেল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৫ টাকায়।
চালের দর খুচরায় বেশি: পাইকারি বাজারে গত কয়েক দিনে চালের দাম বাড়েনি। তবে খুচরা বিক্রেতারা চাল বিক্রি করছেন বেশি দামে। এক সপ্তাহে কোনো কোনো চালের দাম দুই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে মোটা চালের দাম গতকাল ৩২ থেকে ৩৪ টাকা দেখানো হলেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তা বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকায়। নয়াবাজার কাঁচাবাজারে বিআর-২৮ চাল ৩৮ থেকে ৪০, নাজিরশাইল ৪৮ থেকে ৫৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজার ও পলাশী বাজারে দর ছিল নাজিরশাইল ৫২, মিনিকেট ৪৪ থেকে ৪৬, পারিজা ৪০ ও পাইজাম ৩৮ থেকে ৪২ টাকা।
ছোলার দাম চড়ছেই: সাধারণ মানুষ যে ছোলাটা কেনে, রাজধানীর খুচরা দোকানগুলোয় তা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। আর উন্নত মানের ছোলার দাম ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, ছোলার দাম কমেছে। রাজধানীর রহমতগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জে সাধারণ ছোলা ৫৮ থেকে ৬০ এবং উন্নত মানের ছোলা সর্বোচ্চ ৭১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই ধরনের ছোলাতেই দাম কমেছে দুই টাকা।
এ ছাড়া খুচরা দোকানে দেশি মসুর ডাল ৯০ থেকে ৯৫, বিদেশি ডাল ৭৫ থেকে ৮০ এবং মুগ ডাল ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খেজুরের বাজার গরম: রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও দোকানে চড়া দামে খেজুর বিক্রি হচ্ছে। বাংলা খেজুর ৬০, মরিচা ১০০ থেকে ১২০, নাগা ১১০ থেকে ১২০, বড়ই ১৭০ থেকে ১৮০ ও মরিয়ম ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্যাকেটজাত খেজুরের দাম আরও চড়া।
বেড়েছে গুঁড়ো দুধের দাম: গত এক সপ্তাহে গুঁড়ো দুধের দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা। দোকানিরা জানান, এক কেজির প্যাকেটের মার্কস দুধের দাম ৪২০ থেকে বেড়ে ৪৪০, ফ্রেশ ৪১৫ থেকে ৪২৫, ডিপ্লোমা ৪৯০ থেকে ৫১০ টাকা হয়েছে।
মাংস ও মুরগি: ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি দেশি গরুর মাংস ২৭০ এবং বিদেশি গরুর মাংস ২৫০, মহিষের মাংস ২৪০, খাসির মাংস ৪০০, বকরি ও ভেড়ার মাংস ৩৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা।
কারওয়ান বাজারে গিয়ে গতকাল গরুর মাংস ২৭০ ও খাসির মাংস ৪২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। পুরান ঢাকার ধূপখোলা বাজারে গরু ও খাসির মাংসের দাম ছিল ২৭০ ও ৪০০ টাকা।
তবে ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে। কারওয়ান বাজারে এর দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। নয়াবাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকা কেজিতে। আর দুই বাজারেই দেশি মুরগির দর ছিল যথাক্রমে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা।
ডিসিসিকে চিঠি: রাজধানীর সব দোকানে দৃশ্যমান স্থানে নিত্যপণ্যের মূল্যতালিকা টাঙানোর নির্দেশ দিতে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (ডিসিসি) গতকাল চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে খুচরা দোকানিরা ক্রেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করতে পারবেন না।
আমাদের চট্টগ্রামের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চট্টগ্রামে পাইকারি বাজারে গতকাল চিনির সরবরাহ বেড়েছে। এস আলম গ্রুপ উৎ পাদন শুরুর পর ২৪০ জন পরিবেশকের মাধ্যমে চিনি সরবরাহ করছে। গতকাল থেকে ব্যবসায়ী গ্রুপটি পাঁচটি স্থানে চিনি ও ভোজ্যতেল বিক্রি শুরু করেছে। এ পাঁচ স্থানে ৬৫ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি হচ্ছে। তবে সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে সরকারি দরের চেয়ে লিটারপ্রতি দুই টাকা কমে অর্থাৎ ১০৭ টাকায়।
এস আলম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক মীর মইনুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ন্যায্যমূল্যের কেন্দ্রের সংখ্যা ২০-২৫টিতে উন্নীত করা হবে।
এ ছাড়া বিএসএম গ্রুপ ১৪ জন পরিবেশকের মাধ্যমে গতকাল থেকে ছয় টন করে চিনি সরবরাহ করছে। পরিবেশকদের কাছে এই চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকায়। পরিবেশকেরা খুচরা বিক্রেতাদের কেজিপ্রতি ৬৩ টাকায় চিনি সরবরাহ করবেন। পাশাপাশি আজ মঙ্গলবার থেকে ৫৫ টাকায় ছোলাও বিক্রি করবে প্রতিষ্ঠানটি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বাজারে এখন আগের চেয়ে চিনির সরবরাহ বেশি। এ কারণে চিনির দামে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজার থেকে ন্যায্যমূল্যে চিনি কিনতে পারায় চট্টগ্রামের কয়েকটি বাজারের নির্দিষ্ট কয়েকটি দোকানে সরকার-নির্ধারিত মূল্যে চিনি বিক্রি হচ্ছে। কাজীর দেউড়ি বাজারের খান ডিপার্টমেন্ট স্টোর গতকাল ৬৪ টাকায় তিন বস্তা চিনি কিনে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে।
আবার বেশি দামে কেনা খুচরা ব্যবসায়ীরা এখনো ৬৮-৭০ টাকায় চিনি বিক্রি করছেন। কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজারের রাকিন ডিপার্টমেন্ট স্টোরের পরিচালক খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখনো সরকারি দামে চিনি কিনতে পারিনি। এ কারণে এই বাজারে ৬৮-৭০ টাকায় চিনি বিক্রি হচ্ছে।’

Tuesday, July 5, 2011

 কাজ না করেই ১৩ প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের অভিযোগ



বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির ১৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের এসব প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে। তাঁরা কোথাও কোথাও নামে মাত্র এবং বেশ কয়েকটি স্থানে কাজ না করেই প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল-১ নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিক গৌরনদী উপজেলার জন্য ২০১০-১১ অর্থবছরে কাবিটার ১৩টি প্রকল্পে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের আওতায় রাস্তা নির্মাণ শুরু হয় মে মাসে। গত ৩০ জুন প্রকল্পের সভাপতিরা টাকা তুলে নেন।
এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে চলছে হরিলুট। প্রকল্পের সভাপতিরা সড়ক সংস্কারের নামে তাঁদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। রাস্তার মাটি রাস্তায় ফেলে পথচারীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছেন।
বরিশাল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়মানুযায়ী রাস্তার ওপরের অংশে প্রস্থ ১২ ফুট, দুই পাশে ঢাল ২৪ ফুট, উচ্চতা চার ফুট থাকার কথা। সরেজমিনে কয়েকটি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে ওই পরিমাপে কোনো রাস্তা পাওয়া যায়নি।
মাহিলাড়া ইউনিয়নের বেজহার কুব্বত সরদারের বাড়ির ব্রিজ থেকে গুয়াবাড়িয়া হয়ে কেবলারভিটা পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় (প্রকল্প নম্বর ৩)। মাহিলাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কালাম মৃধা এ প্রকল্পের সভাপতি। সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো রাস্তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। শ্রমিকেরা রাস্তার উঁচু স্থানের মাটি অপসারণ করে নিচু স্থানে দিচ্ছেন।
প্রকল্প এলাকার বেজহার গ্রামের আবদুর রহমান ও শরীফাবাদ গ্রামের গফুরসহ কয়েকজন জানান, প্রকল্পের প্রায় এক কিলোমিটারে কোনো কাজ করা হয়নি। রাস্তায় মাঝেমধ্যে উঁচু স্থানের মাটি কেটে নিচু স্থানে ফেলে সমান করা হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে সামান্য কিছু মাটি ফেলা হয়েছে। এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, এ রাস্তায় এক লাখ টাকাও ব্যয় করা হয়নি।
প্রকল্পের সভাপতি মো. আবুল কালাম মৃধা বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে। আমি সঠিকভাবেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।’
বাটাজোর ইউনিয়নের জয়শুরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঘেয়াঘাট হয়ে শাহী মসজিদের পাশ দিয়ে সিঅ্যান্ডবি পর্যন্ত রাস্তা এবং বাটাজোর সিঅ্যান্ডবি থেকে আনন্দ সমাদ্দারের বাড়ি হয়ে মোল্লাবাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১ নম্বর প্রকল্পের আওতাধীন এ কাজ বাস্তবায়নে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর সভাপতি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রব হাওলাদার। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, রাস্তা চাঁচা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি। নামে মাত্র কাজ করে পুরো প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
আবদুর রব হাওলাদার বলেন, অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। প্রকল্পের ডিজাইন অনুসরণ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বার্থী ইউনিয়নের মহব্বত আলী মেম্বারের বাড়ি থেকে উত্তর মাদ্রা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার (প্রকল্প নম্বর ১০) প্রকল্পের সভাপতি ছাত্রলীগের নেতা সোহাগ হাওলাদার। রাজাপুর ব্রিজের গোড়া থেকে মৈস্তারকান্দি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার (প্রকল্প নম্বর ৮) করেন বার্থী ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নিতাই মণ্ডল। এ দুটি প্রকল্পে সাড়ে ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, এ রাস্তায় তেমন কোনো কাজ হয়নি। রাস্তার মাটি এক স্থান থেকে কেটে অন্য স্থানে ফেলা হয়েছে। সোহাগ ও নিতাই মণ্ডল রাস্তায় সংস্কারের কাজে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন।
গৌরনদীর পিআইও মো. কবির উদ্দিন বলেন, প্রথম দিকে কাজের মান কিছুটা খারাপ ছিল, পরে তা সংশোধন করা হয়। বর্তমানে তেমন কোনো সমস্যা নেই।

Monday, July 4, 2011

 দলিল জালিয়াতি ও তথ্য লোপাটের চক্র


ঢাকার ১০টি ভূমি সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে আমমোক্তারনামার নিবন্ধন নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ নিয়মিত ব্যাপার। জালিয়াতির কারণে মামলার সংখ্যাও অনেক। জালিয়াতির আরেক বড় ক্ষেত্র জেলার একমাত্র মহাফেজখানাটি।
নিবন্ধনের তথ্যপ্রমাণ থাকে মহাফেজখানায়। সুরক্ষা ও সংরক্ষণের অভাবে সেখান থেকে নিবন্ধনের তথ্য গায়েব হয়ে যাচ্ছে। দলিলের অবিকল নকল তোলা ও জমি কেনাবেচার সময় তথ্য যাচাই করতে মানুষ মহাফেজখানার দ্বারস্থ হয়। তখন ভোগান্তি ও খরচ লেগেই থাকে।
ভূমি নিবন্ধন দপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা বলেন, এ চিত্র পুরো দেশেই এক রকম।
আমমোক্তারনামা দলিল জালিয়াতি: মূল মালিক অন্য কোনো ব্যক্তিকে জমির তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা দেওয়ার জন্য আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দলিল তৈরি করে থাকেন। বিদ্যমান আইন অনুসারে আমমোক্তারনামা দলিল তৈরি করতে কোনো ধরনের ছবি বা দালিলিক প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
সাব-রেজিস্ট্রাররা জানান, আইনগত এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসগুলোতে ভুয়া আমমোক্তারনামা দলিল তৈরি হচ্ছে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এক উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসেই নয়টি ভুয়া আমমোক্তারনামা দলিল চিহ্নিত হয়েছে।
ভূমি নিবন্ধন অফিস ডিজিটালকরণ কমিটির পরামর্শক ও ভূমি নিবন্ধন অফিসের সাবেক পরিদর্শক নারায়ণচন্দ্র দাশ বলেন, আইনি দুর্বলতার সুযোগে সারা দেশে প্রচুর ভুয়া আমমোক্তারনামা দলিল তৈরি হচ্ছে। জালিয়াতেরা দখল করে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের জমি। অন্যের জমি দখল করে বহুতল ভবন বানাচ্ছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে হাজার হাজার মামলাও রয়েছে। তিনি আরও জানান, একজন সাব-রেজিস্ট্রার একবার ভুলভাবে কোনো জমি নিবন্ধন করলে তা শুধরানোর সুযোগ তাঁর নেই। এ নিয়েও সারা দেশে প্রচুর মামলা হচ্ছে।
অরক্ষিত মহাফেজখানা: সাধারণত জমি নিবন্ধন হয়ে থাকে সাব-রেজিস্ট্রারের কক্ষে। এরপর নিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষণ করা হয় নিবন্ধন বইয়ে। যেকোনো নিবন্ধন বই এক বছর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে থাকার পর তা সংরক্ষণের জন্য মহাফেজখানায় পাঠানো হয়। জমিজমাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষের ভরসা এই মহাফেজখানা।
ভূমি নিবন্ধন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও ডিজিটালকরণ-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে এই মহাফেজখানা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত নিবন্ধন বইগুলো বহু ব্যবহারে বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু, অপাঠ্য ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ জন্য তল্লাশিতে সময় ব্যয় হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দলিলের তথ্য গায়েব: মহাফেজখানা সূত্র জানায়, তল্লাশি করতে গেলে মাঝেমধ্যেই সংরক্ষিত নিবন্ধন বইয়ের পাতা ছেঁড়া পাওয়া যায়। কর্মকর্তাদের ধারণা, জালিয়াত চক্র এসব করছে।
সম্প্রতি মহাফেজখানার ১৬৫ নম্বর নিবন্ধন বইয়ের ২৩১ থেকে ২৩৬ ও ১৩৯ থেকে ২৪৮ নম্বর পৃষ্ঠা এবং ১১৫ নম্বর বইয়ের ৫১ থেকে ৫৪ নম্বর পৃষ্ঠা ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। এরপর সাব-রেজিস্ট্রার জসিমউদ্দিন ভূঁইয়াকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কারওয়ান বাজারের ১২৮ নম্বর খতিয়ানের (সিএস দাগ ৯৪, ৯৫, ৯৬) ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ জমির মালিক একই এলাকার বাসিন্দা রাবিয়া খানম। খায়রুন্নেসা, ওয়াহিদা ইয়াসমীন, আবুল বাশার ও আবু তালেব মিয়া নামের চার ব্যক্তি নিজেদের এই জমির মালিক দাবি করে ভুয়া দলিল করেন। ভুয়া দলিলকে মূল দলিল হিসেবে প্রমাণ করার জন্য মহাফেজখানায় সংরক্ষিত মূল দলিলের তথ্য নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
গত ১৬ মে ভুয়া দলিলধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন।
সম্প্রতি ১৯৭৭ সালের ১০ নম্বর নিবন্ধন বইয়ের ৯১ থেকে ৯৪ নম্বর পৃষ্ঠাও ছেঁড়া পাওয়া গেছে। গত ১৫ মে সাভারের জ্যেষ্ঠ সহকারী হাকিমের (দেওয়ানি মামলা ৫৯৫৭/২০০৮) আদালত থেকে এ নিবন্ধন বইটি তলব করা হয়। কিন্তু যে জমি নিয়ে মামলা, সে তথ্যসম্পর্কিত পৃষ্ঠাগুলো ছিল না। এ-সম্পর্কিত সূচিবইও নষ্ট হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯ জুন জমির মালিকানা নির্ধারণের জন্য মহাফেজখানা থেকে এ-সম্পর্কিত টিপবইটি আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ঢাকা বড় লোভনীয়: গত ২১ জুন ঢাকার ভূমি নিবন্ধন অফিসের মহাফেজখানায় দলিলের নকল পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেন নুরুল ওহাব। তাঁর বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বাঙ্গালগাঁও গ্রামে। তিনি জানান, তাঁর বাবা মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ থেকে ’৭৬ সালের কোনো একসময়ে প্রায় এক বিঘা জমি কিনেছিলেন। সে সময়ে নিবন্ধন হলেও জমির নামজারি হয়নি।
সম্প্রতি তাঁর ঘর থেকে সেই জমির মূল দলিল চুরি হয়ে গেছে। এর পর থেকেই কিছু ব্যক্তি নিজেদের ওই জমির মালিক দাবি করে দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মহাফেজখানার তল্লাশিকারক সচিন্দ্র চন্দ্র সাহা জানান, ১৯৭৪ থেকে ’৭৬ সালের নিবন্ধনের সূচিবই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এর তথ্য খুঁজে বের করা দুরূহ কাজ।
গত ২৫ জানুয়ারি সাব-রেজিস্ট্রার দ্বীপক কুমার সরকারকে ঢাকার মহাফেজখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ঢাকা এবং এর আশপাশের জমির দাম লোভনীয় বলেই ঢাকার মহাফেজখানাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু জালিয়াত চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। মূলত মহাফেজখানাটি দীর্ঘ সময় অরক্ষিত থাকায় এই চক্রটি জাল দলিল করে মহাফেজখানা থেকে মূল দলিল গায়েবের কাজটি করে যাচ্ছে।
মহাফেজখানাতেও মধ্যস্বত্বভোগী! মহাফেজখানাকে কেন্দ্র করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও রয়েছে। মহাফেজখানা থেকে দলিলের তথ্য খুঁজে বের করেন তল্লাশিকারকেরা। নকলনবিশেরা সেটার নকল তৈরি করেন। জেলা অফিসের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৩০ হাজার ২৫৭টি দলিলের নকল সরবরাহ হয়েছে। এ হিসাবে ১০টি অফিস থেকে প্রতিদিন ২০০টির বেশি দলিলের নকল সরবরাহ হয়ে থাকে।
কিন্তু সরকারি ফির বাইরে সাধারণত দুই হাজার টাকার নিচে ঢাকার মহাফেজখানার তল্লাশিকারকেরা নিবন্ধন বইয়ে হাত দেন না। কলম খোলেন না নকলনবিশও। অথচ জমি নিবন্ধনের তথ্য তল্লাশির জন্য সরকারি ফি প্রতিবছরের জন্য ১০ টাকা, সর্বোচ্চ ৮০ টাকা। তল্লাশিকারকের প্রতিদিনের ফি তিন টাকা। দলিলের নকলের জন্য সরকারি ফি প্রতি ৩০০ শব্দে নয় টাকা এবং নকল লেখার জন্য নকলনবিশের সরকার-নির্ধারিত ফি প্রতি পাতা ১৫ টাকা।
ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা আসিফুর রহমান তমাল (২২) জানান, তিনি ১৯৯৬ সালের একটি দলিলের নকল তুলেছেন পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে। তল্লাশিকারক রুবেল মিয়া ১৯৬৩ সালের একটি দলিলের (নম্বর ৪৮৮৩) নকল সরবরাহের জন্য এই প্রতিবেদকের কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করেন।
যবে হবে, তবে ঘুচবে: ভূমি নিবন্ধন অফিসের দুর্ভোগ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, যুগোপযোগী আইনের অভাবে ভূমি নিবন্ধন অফিসে অব্যাহতভাবে জনদুর্ভোগ, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতি ঘটনা ঘটে থাকে। সবচেয়ে বেশি ত্রুটিপূর্ণ হলো আমমোক্তারনামা আইন। যে কারণে সরকার আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। আইনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ছবি দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে।
আইনমন্ত্রী আরও জানান, ভূমি নিবন্ধনের জটিলতা দূর করতে নিবন্ধন-পদ্ধতি ডিজিটাল করার বিকল্প নেই। এ জন্য ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সূচি, মূল নিবন্ধন বই ও টিপবইয়ের প্রতিচ্ছবি (স্ক্যান করা কপি) ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হবে। দলিলের ফরম অনলাইনে পাওয়া যাবে। ক্রেতা নিজেই সেই দলিল লিখতে পারবেন। এ জন্য কোনো দলিল লেখকের প্রয়োজন হবে না।

হয়রানি, ঘুষ আর দলিলজট

ঢাকা মহানগরের ১০টি ভূমি নিবন্ধন অফিসে মাসে গড়ে ১১ হাজারের কাছাকাছি দলিল নিবন্ধন করাচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতা ও জমির মালিকেরা। নিবন্ধনকারী অর্থাৎ সাব-রেজিস্ট্রার অবধি পৌঁছাতে তাঁরা দলিল লেখক ও নানা ধাপের দালালদের কাছে জিম্মি।
নিবন্ধনের পর পাকা দলিল হাতে পেতে ঘুরতে হচ্ছে বছরের পর বছর। আটটি অফিসে এখন জমে আছে অন্তত এক লাখ ৩৮ হাজার দলিল তৈরির কাজ। ছয় মাস ধরে নিবন্ধন বই বা বালামের (ভলিউম) সরবরাহ নেই। নেই নিবন্ধন ফি আদায়ের পাকা রসিদ।
ঢাকা মহানগর দেশের ভূমি অফিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করে। অথচ যাঁরা এই রাজস্বের জোগান দেন, প্রতিটি ধাপে তাঁদের পাওনা হয়রানির পাশাপাশি উপরি খরচ।
জেলা রেজিস্ট্রার সুভাষ চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে জানি, ঘুষ ছাড়া ভূমি নিবন্ধন অফিসে কোনো কাজ হয় না। কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই।’ তাঁর মতে, যত দিন পর্যন্ত দাতা ও গ্রহীতা স্বহস্তে দলিল না লিখতে পারবেন, তত দিন দলিল লেখক বা দালাল নামের মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা লুটবে। মানুষের হয়রানি চলতে থাকবে। তিনি বলেন, দেশজুড়ে ভূমি নিবন্ধন অফিসের চিত্র এ রকমই।
তথ্যসংকট দিয়ে দুর্ভোগের শুরু: জেলা নিবন্ধন অফিসের তথ্য বলছে, ২০১০ সালে ঢাকার ১০টি সাব-রেজিস্ট্রারের অফিসে এক লাখ ৩০ হাজার ২৭০টি দলিল নিবন্ধন হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নিবন্ধন হয়েছে ৩১ হাজার ৭১টি দলিল। এই হিসাবে প্রতি অফিসে মাসে গড়ে এক হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধন হয়। একই হারে দলিলের নকলও সরবরাহ করা হয়।
জেলা অফিসের হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আয় হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। এটা সারা দেশের মোট ভূমি নিবন্ধন রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ। অথচ রাজস্বের জোগানদাতা ক্রেতা-বিক্রেতারা কোথায় গেলে কী সেবা পাবেন, আইন কী বলছে—এসব জানানোর ব্যবস্থা অফিসগুলোয় নেই।
তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক, কিন্তু তেজগাঁওয়ের জেলা ভূমি নিবন্ধকের দপ্তরে কোনো তথ্য কর্মকর্তা পর্যন্ত নেই। নেই তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানোর কোনো জায়গা।
হয়রানি ও উপরি খরচ: দশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুটি মিরপুর ও ডেমরায়। বাকি আটটি ঢাকা সদর, তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, সূত্রাপুর ও উত্তরার সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিস তেজগাঁওয়ের জেলা নিবন্ধন দপ্তরের চত্বরে। সেখানে ১২ জুন দুপুরে কামরাঙ্গীরচরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম জানান, কোনো তথ্যকেন্দ্র না থাকায় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি একজন দলিল লেখকের শরণাপন্ন হয়েছেন।
দলিল লেখকের ভূমিকা অনেকটা উকিলের মতো। ক্রেতা-বিক্রেতা চাইলে এঁদের কাছ থেকে আইনি ও দালিলিক সহায়তা নিতে পারেন। কিন্তু কার্যত অফিসের আঙিনায় পা দেওয়া মাত্র দলিল লেখক, তাঁদের সহকারী ও দালালেরা ক্রেতা-বিক্রেতাদের ছেঁকে ধরেন। এঁদের এড়িয়ে কেনাবেচার কাজ করা প্রায় অসম্ভব। এরপর নিবন্ধন অফিসের প্রধান কেরানি, অধস্তন কেরানি, পিয়ন, মোহরার, টিপসহি নেওয়া কর্মচারী এবং সাব-রেজিস্ট্রারের পাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা রাতের পাহারাদার তথা নাইটগার্ডদের খুশি না করে সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ মেলে না।
তেজগাঁও থানার সাব-রেজিস্ট্রার আবুল কালাম আজাদ বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই মানুষের হয়রানি। অন্যদিকে দলিল লেখকেরা দোষ চাপান সাব-রেজিস্ট্রারদের ওপর।
সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: ১৯০৮ সালের ভূমি নিবন্ধন আইনে ৬৩ ধরনের ভূমি নিবন্ধনের কথা বলা আছে। এর মধ্যে বেশি হয় চারটি—কবলা বা হস্তান্তর, হেবা, হেবার ঘোষণা ও দানপত্র। কবলার সরকারি ফি বিভিন্ন খাত মিলিয়ে জমির সরকারিভাবে নির্ধারিত মোট দামের নয় শতাংশ। এর জন্য জমির মালিকানার কাগজ, পরচা, নামজারি, দাখিলা বা খাজনা রসিদ ও ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ লাগে।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, এসব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রতিটি নিবন্ধনের ক্ষেত্রেই সাব-রেজিস্ট্রারদের ঘুষ দিতে হয়। সরকারি হিসাবে জমির দাম কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা ঘুষের অন্যতম কারণ। জমির প্রকৃত দামভেদে ঘুষের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দলিল লেখক সমিতির মহাসচিব এম এ রশিদ বলেন, সাব-রেজিস্ট্রাররা তাঁদের নাইটগার্ড বা পিয়নদের মাধ্যমে ঘুষ দাবি করেন।
মগবাজারের (৩৪৬ নয়াটোলা) আবুল কাসেম (৬৫) ঢাকা সদর অফিসে গিয়েছিলেন আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) অর্থাৎ নিজের অনুপস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ককে ক্ষমতা দেওয়ার দলিল করতে। ১৭ মে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার রুহুল ইসলাম তাঁর নাইটগার্ড রানার মাধ্যমে তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। ঢাকা সদরের এই সাব-রেজিস্ট্রার নিবন্ধনের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) মুন্সী নজরুল ইসলামের ভাতিজা।
দলিল লেখক মাহবুব হোসেন অভিযোগ করেছেন, রুহুল ইসলামের দপ্তরে তাঁর একই রকম অভিজ্ঞতা হয়। এরপর দলিল লেখক সমিতি রুহুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইজিআরের কাছে লিখিত অভিযোগ জানায়। গত ২৯ মে আইজিআর রুহুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে রুহুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের যথাযথ উত্তর আমি লিখিতভাবে জেলা রেজিস্ট্রারকে জানিয়েছি।’
দলিল লেখক আখতারুজ্জামান বলেন, ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে তিনি বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জসিমউদ্দিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। একই বিষয়ে তিনি দুদকেও অভিযোগ করেছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জসিমউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি জমি রেজিস্ট্রেশনের আগ পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে দালাল বা দলিল লেখকদের কী অঙ্কের টাকা বিনিময় হয়, সেই তথ্য জানার সুযোগ আমার নেই। যদি লেনদেন হয়েও থাকে, সেই দায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে আমাকেই বহন করতে হবে।’
দলিল লেখকদের ফাঁদে: গত ১৫ জুন মহাখালী ডিওএইচএসের বাসিন্দা ফরিদ আক্তার একটি দলিল লেখার জন্য এক দলিল লেখককে তিন হাজার টাকা দেন। তিনি জানান, আশপাশের দালাল এবং নিবন্ধন অফিসের কর্মচারীরাও তাঁর কাছ থেকে টাকা খসিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী একটি দলিল লিখে দেওয়ার জন্য লেখককে ৬৯ টাকা দিতে হয়। কিন্তু দলিল লেখকেরা একটি দলিল লিখে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাঁচ-ছয় হাজার এবং ব্যক্তি পর্যায়ে দুই-তিন হাজার টাকা করে নিয়ে থাকেন। তেজগাঁও দলিল লেখক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ৬৯ টাকায় দলিল লিখে দিলে কারও সংসার চলবে না।
রসিদ ও নিবন্ধন বই নেই: সাব-রেজিস্ট্রারেরা জানান, বর্তমানে এই দশ দপ্তরে জমি নিবন্ধন ফি আদায়ের রসিদ বই নেই। তাঁরা সাদা কাগজে সিল-স্বাক্ষর দিয়ে তা জমির মালিকদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। সরকারের ছাপাখানা (বিজি প্রেস) থেকে সর্বশেষ রসিদ বই সরবরাহ করা হয়েছিল ২০১০ সালের আগস্টে।
নেই নিবন্ধন বই। ফলে নিবন্ধনের পর জমির দলিল হাতে পাওয়া আরেক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। জেলা নিবন্ধন অফিস সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি এক লাখ নিবন্ধন বই ছাপা হয়েছিল। এসব বই ফুরিয়ে গেছে প্রায় ছয় মাস আগে। যে কারণে নিবন্ধন বইয়ে তথ্য সংরক্ষণ এবং দলিল সরবরাহের কাজ পিছিয়ে পড়ছে। এক বছর ধরে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বিজি প্রেস নিবন্ধন বই সরবরাহ করছে না।
এক লাখ ৩৮ হাজার দলিলের জট: গত ১৩ জুন গুলশান সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে ১৪টি দলিল সরবরাহ করা হয়েছে। সূত্র বলছে, এসব দলিলের একটি ২০০৫ সালে, ১২টি ২০০৬ সালে এবং একটি ২০০৭ সালে নিবন্ধিত হয়েছিল।
জেলা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের আটটি সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসে বর্তমানে এক লাখ ৩৮ হাজার দলিল তৈরির কাজ ঝুলে আছে। এক গুলশান অফিসেই জমে আছে ৪৪ হাজার ৫০০ দলিল তৈরির কাজ। মোহাম্মদপুর অফিসে রয়েছে ২৭ হাজার, বাড্ডায় ২৩ হাজার ৩০০, উত্তরায় ২০ হাজার ৫৩৬, ঢাকা সদরে ১০ হাজার ৭২৮, সূত্রাপুরে নয় হাজার ৮৫৫ এবং খিলগাঁওয়ে দুই হাজার ৮৬১। সবচেয়ে কম ১৭৯টি দলিল লেখার কাজ অসমাপ্ত আছে তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসে। মিরপুর ও ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসের এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০১০ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের ভূমি নিবন্ধন পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও ডিজিটালকরণের লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পদ্ধতির কারণে জমি নিবন্ধন শেষে কত দিন পর দলিল সরবরাহ করা হবে, সে সম্পর্কে সাব-রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে জমির ক্রেতাকে দলিল লেখকের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দলিল সরবরাহ করতে তিন মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে থাকে।
সাব-রেজিস্ট্রারেরা বলেন, নিবন্ধন শেষে তাৎক্ষণিক মূল দলিল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে প্রতিটি অফিসে মাসে গড়ে এক হাজারের বেশি দলিলের নকল তৈরি করতে হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মূল দলিল সংগ্রহ করতে এসে জমির মালিকদের আবারও হয়রানির শিকার হতে হবে এবং গুনতে হবে বাড়তি টাকা।

Monday, June 27, 2011

ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ


জাপানি অধ্যাপক আজুমার সঙ্গে দারাদ আহমেদ (বাঁয়ে)
ফাইল ছবি
‘জাপান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ করার নামে জাপানি এক অধ্যাপকের কাছ থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এক বাংলাদেশি। রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশপ্রেমী ওই জাপানি অধ্যাপক প্রতারণার এ ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন।
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার নামে প্রতারণা করেছেন দারাদ আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি। নিজেকে তিনি রবীন্দ্রগবেষক ও বিশ্বভারতীর ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায়।
জাপানের প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, অধ্যাপক কাযুও আজুমা জাপানে রবীন্দ্রগবেষক এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। নিজের একক প্রচেষ্টায় জাপান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি কলকাতায় ‘ভারত-জাপান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ করেছেন। বিশ্বভারতীতে ‘নিপ্পন ভবন’ তৈরিতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ভারতের এ দুই প্রতিষ্ঠান জাপান-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আজুমার স্ত্রী কেইকো আজুমাও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক।
কেইকো আজুমা কিছুদিন আগে প্রথম আলোর টোকিও কার্যালয়ে চিঠি লিখে প্রতারণার বিষয়টি জানিয়েছেন। কেইকো জানান, ২০০৩ সালে কলকাতা সফরের সময় তাঁর সঙ্গে পরিচিত হন দারাদ আহমেদ নামের এক বাংলাদেশি। তিনি নিজেকে বিশ্বভারতীর সংগীতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেন, এর আগে কিছুদিন তিনি নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়ও সাংবাদিকতা করেছেন। দারাদ দাবি করেন, তাঁর মা-ও একজন রবীন্দ্রভক্ত। পেশায় তিনি মস্তিষ্কের শল্যচিকিৎসক (সার্জন) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ করেন। এ কারণেই পেশাগত দায়িত্বে তাঁকে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াতে হয়।
কেইকো জানান, ভারতের মতো বাংলাদেশেও একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার ইচ্ছা তাঁদের ছিল। দারাদের এসব কথায় আজুমা ও তাঁর মনে হয়েছে, বাংলাদেশে তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে হলে এর চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি তো আর অন্য কেউ হতে পারে না। এদিকে কলকাতা থেকে জাপানে ফেরার পর দারাদ এ বিষয়ে অনেকগুলো চিঠি লেখেন। একপর্যায়ে দারাদের মা-ও চিঠি লিখতে থাকেন।
আজুমার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দারাদ ২০০৪ সালে জাপানে চলে আসেন এবং তাঁর চেয়ে ২০ বছরের বড় এক জাপানি রমণীকে বিয়ে করেন। আজুমার পরিবারের সহায়তায় তিনি জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি জোগাড় করেন। একপর্যায়ে দারাদ তাঁকে ‘জাপান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ করার পরামর্শ দেন। দারাদ বলেন, তিনি প্রকল্পের সব দেখভাল করবেন। আজুমাকে শুধু অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
কেইকো জানান, ‘দারাদ তাঁকে বিষয়টি গোপন রাখার এবং আর কোনো বাংলাদেশিকে এ ব্যাপারে সম্পৃক্ত না করার অনুরোধ জানান। দারাদ তাঁকে বোঝান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি ঢাকা শহরে নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের দেখিয়ে দেওয়া পথ অনুসরণ করে মফস্বলের কোথাও তৈরি করা উচিত। আর তিনি যেহেতু সাইফুর রহমানের (প্রয়াত অর্থমন্ত্রী) নিকটাত্মীয়, ফলে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় তাঁর নিজ গ্রাম হবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরির সবচেয়ে জুতসই জায়গা।
আজুমা জানান, দেশে ফিরে দারাদ ও তাঁর মা বিরামহীনভাবে অর্থের জন্য তাগিদ দিতে থাকেন। তিনিও টাকা দিতে থাকেন। একপর্যায়ে দারাদ ও তাঁর মা আজুমা দম্পতিকে আমন্ত্রণ জানান মৌলভীবাজারের বড়লেখায়। সেখানে একটি ইটের ভাটায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপনের ছবিও তোলেন। এ সময় দারাদ জানান, আরও টাকা পেলে এই কেন্দ্র ভালো করে তৈরি করা যাবে। 
মোট কত টাকা দিয়েছেন জানতে চাইলে জাপানি এই দম্পতি জানান, সব মিলিয়ে জাপানের ৭৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাঁরা ছয় কোটি ৮০ লাখ জাপানি ইয়েন (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা) সংগ্রহ করেন। এর বাইরে দারাদ ও তাঁর মা তাছলিমা খানমের লিখিত আবদারের ভিত্তিতে অতিরিক্ত আরও অর্থসহ মোট ছয় কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার ইয়েন (প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা) দেওয়া হয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করার জন্য। কিন্তু দারাদ এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
বারবার চিঠি, বারবার টাকা দাবি: তাছলিমা খানম একটি চিঠিতে বলেন, ‘২০০৭ সালের ১০ থেকে ২০ মে পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কাজ খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ২০০৭ সালের আগস্টে আমরা ভবন উদ্বোধন করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জাপানের সব সুযোগ-সুবিধা, লিফট, পার্কিং, বাগান, এয়ারকন্ডিশন, উন্নত বাথরুম থাকছে এখানে। আমরা প্রথম নকশা থেকে আরও বড় করেছি। আমি নিজে এই ভবন তৈরির জন্য তিন হাজার ৫০০ মান (এক মান মানে ১০ হাজার ইয়েন) খরচ করেছি। বর্তমানে আমার চাকরির বেতন দিয়ে চলতে পারছি না বিধায় আপনার সহায়তা কামনা করছি। আর দেড় হাজার ইয়েন হলে আগস্টে ভবনটি উদ্বোধন করা যাবে।’ চিঠিতে বলা হয়, এ বিষয়ে ১০ দিন ধরে বৈঠক হয়। এতে যোগ দেন তপন কুমার দেবনাথ, মুক্তাদির হোসেন, রিয়াজুল ইসলাম, তপন চৌধুরী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, কবির আনোয়ার প্রমুখ।
২০০৯ সালের ২০ আগস্ট আরেক চিঠিতে তাছলিমা লেখেন, ‘ভবনের চতুর্থ তলার কাজ শেষ হয়ে গেছে। বাকি রইল একতলা। খুব তাড়াতাড়ি কাজ করতে হচ্ছে। আমার চাকরির টাকায় কাজ করাচ্ছি। আপনাকে নিয়ে এই ভবন উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। ভবনে খুব দামি পাথর লাগানোর জন্য অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। আরও কিছু টাকা দরকার।’
২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাছলিমা আরেকটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘আমি আবারও প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছি। আগামী বছরের জানুয়ারিতে ভবন উদ্বোধন করতে চাই। আপনাদের সাহায্য ছাড়া কাজ শেষ করতে পারছি না। খুবই মূল্যবান গ্লাস ও পাথর লাগানোর জন্য খুব বেশি খরচ হচ্ছে। আর মাত্র ৬০০ মান দেবেন। এরপর আর টাকা চাইব না।’
২০১০ সালের ২৮ জুন এক চিঠিতে বলা হয়, ‘দুই দিন আগে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। আগামী মাসের ২৫ তারিখে ভবন উদ্বোধন করা হবে। এখন শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। টাকা লাগবে। আমি আমার গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে ভবনের কাজ করছি। দয়া করে আর মাত্র ৩৬০ মান পাঠাবেন।’
২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর আরেক চিঠিতে বলা হয়, ‘টাকার অভাবে এখনো ভবনে নিরাপত্তা ক্যামেরা ও এয়ারকন্ডিশন লাগাতে পারিনি। সুখবর হলো, ভবন উদ্বোধন করা হলে সরকার টাকা দেবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। তাই আপাতত ধার হিসেবে ২০০ মান চাইছি। আগামী মাসে ভবন উদ্বোধন করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রী আর আসবেন না। আমিও সরকারি চাকরি থেকে অবসরে চলে যাব। আপনার টাকার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।’
২০১০ সালের জানুয়ারিতে ভবন উদ্বোধনের একটি আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় আজুমা দম্পতির কাছে। তাতে বলা হয়, ‘২৯ জানুয়ারি জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টারের শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা অনুষ্ঠানে গান গাইবেন। নৃত্য পরিবেশন করবেন শামীম আরা নীপা ও শিবলী মহম্মদ। আমন্ত্রণে দারাদ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার ও তাছলিমা খানম, পরিচালক, জাপান-বাংলাদেশ কালচারাল সেন্টার।’
যেভাবে প্রতারণা ধরা পড়ে: বারবার টাকা পাঠানোর অনুরোধ করায় টাকা দিয়েছেন এমন কয়েকজন জাপানির মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তাঁরা এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। তবে আজুমা সন্দেহ করেননি। কিন্তু বারবারই উদ্বোধনের তারিখ পেছানো হয়। একপর্যায়ে দারাদ যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তখন আজুমা দম্পতি বুঝতে পারেন, তাঁরা প্রতারণার শিকার।
বর্তমান অবস্থা: অধ্যাপক কাযুও আজুমা বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী। বাংলা ভাষা ও বঙ্গভাষীদের কল্যাণে আজীবন নিজেকে নিবেদিত রেখে জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তাঁকে এভাবে যে প্রতারণার শিকার হতে হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি।
কেইকো আজুমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামী অধ্যাপক কাযুও আজুমা সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন রবীন্দ্রচর্চায়। আমার স্বামী ও আমি বাঙালিদের ভীষণ ভালোবাসি। তাদের বিশ্বাস করি। দারাদ আহমেদকেও সেভাবে ভালোবেসেছি, বিশ্বাস করেছি। এর আগে বাঙালিদের নিয়ে কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি আমাদের। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যে এভাবে ঠকে যেতে হবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর জাপান সফরের সময় অধ্যাপক আজুমা তাঁর দোভাষী হিসেবে কাজ করেন এবং সেই সূত্রে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। এ ছাড়া গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরের সময় তাঁর খোঁজখবর নেন। পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস সে সময় আজুমার সঙ্গে দেখা করে তাঁকে ফুলের তোড়া উপহার দেন।
কেইকো এখনো চান, ‘জাপান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ বাস্তবায়িত হোক। তিনি ঘটনার বিচার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার স্বামীকে ভালো করে চেনেন। গত বছর তাঁর জাপান সফরের সময় তিনি আমার স্বামীর খোঁজখবর নিয়েছিলেন এবং ওর জন্য ফুল পাঠিয়েছিলেন। আমি তাঁর কাছে ঘটনার বিচার দাবি করছি।’
প্রথম আলো

Friday, June 24, 2011

অবৈধ অর্থ লেনদেন মামলা কোকোর ৬ বছরের জেল



আরাফাত রহমান কোকো
বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া কোকোকে জরিমানা দিতে হবে প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি টাকা। 
সিঙ্গাপুরে ২০ কোটি টাকার বেশি অর্থের অবৈধ লেনদেনের দায়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালত এ রায় দিয়েছেন। সিঙ্গাপুর থেকে এই টাকার সমপরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতেও আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ খাতে সিমেন্সকে কাজ পাইয়ে দিতে এই অর্থ ঘুষ নিয়েছিলেন আরাফাত রহমান কোকো।
মামলার অপর আসামি সাবেক মন্ত্রী মরহুম লে. কর্নেল আকবর হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন সায়মনকে একই দণ্ড দিয়েছেন আদালত। আদালত মোট জরিমানা করেছেন ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা কোকো ও সায়মনকে অর্ধেক অর্ধেক করে দিতে হবে। 
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক মোজাম্মেল হোসেন আসামি কোকো ও সায়মনকে পলাতক দেখিয়ে গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, আসামিদের আদালতে হাজির হয়ে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা হাজির হননি। আসামিরা গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণ করার তারিখ থেকে এ রায় কার্যকর হবে। 
জিয়া পরিবারের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে এই প্রথম কোনো মামলার রায় দেওয়া হলো।
গতকাল দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রায় ঘোষণা করা হয়। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের হট্টগোলের মধ্যেই বিচারক রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান। রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ২(ক) আ, ই ১৩ ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় দুজনকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবী ‘প্রহসনের রায় মানি না’ বলে আদালতকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। 
মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল গত বছর ৩০ নভেম্বর। চলতি বছর ৪ জানুয়ারি কোকো পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ শুরু হয়। ১৯ জুন যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। 
এর আগে ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ রাজধানীর কাফরুল থানায় দুদক এ মামলা করে। সিঙ্গাপুরে ২৮ লাখ ৮৪ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার এবং নয় লাখ ৩২ হাজার ৬৭২ মার্কিন ডলার (সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৮ টাকা) অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয় দুদক।
২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর কোকোকে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০০৮ সালের মে মাসে তাঁকে সাময়িক মুক্তি (প্যারোল) দিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর কয়েক দফা এর মেয়াদ বাড়ানোর পর গত ১৪ আগস্ট প্যারোলের মেয়াদ শেষ হয়। ১৯ আগস্ট প্যারোল বাতিল করে ৩১ আগস্টের মধ্যে দেশে ফিরতে চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোকোর পক্ষে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ আগস্ট হাইকোর্ট ৪০ দিনের জন্য প্যারোলের মেয়াদ বাড়ালেও এর শর্ত ভঙ্গ করায় আপিল বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। এরপর বিচারিক আদালত কোকোর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
আদালত পরিস্থিতি: গতকাল বেলা ১১টার আগেই আওয়ামী ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতকক্ষে জড়ো হন। ১১টা ২০ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। প্রথমেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার শুনানি হয়। এ মামলায় আসামিপক্ষ সময়ের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এরপর আদালত থেকে জানানো হয়, দুপুর ১২টার পর রায় ঘোষণা করা হবে। এ সময় থেকেই বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতকক্ষের বাইরে ও আদালত চত্বরে মিছিল এবং ‘কোকোর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় প্রহসনের বিচার মানি না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে আদালত ভবনে আইনজীবীরা দলবদ্ধ হয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। 
গতকাল আদালত এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। সকাল থেকেই পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন ছিল। 
কোকোর সাজার রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতির কক্ষের সামনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে আইনজীবীরা জড়ো হতে থাকেন। পরে তাঁরা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। সমাবেশ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ সাজা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট ও আইনজীবী সমিতি ভবনের সংযোগ পথে রাখা ফুলের টব ভাঙচুর করেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় তলা থেকে ফুলের টব ছুড়ে ফেলে দিলে নিচে থাকা দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 
অন্যদিকে রায় ঘোষণার পর আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা রায়কে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করেন।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া: রায়ের পর দুদকের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) সিমেন্সের একটা ঘুষ কেলেঙ্কারি তদন্ত করতে গিয়ে কোকোকে ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে তথ্য পায়। সেই কাগজপত্র থেকে শুরু হয় অনুসন্ধান, পরে এজাহার করা হয়। তথ্যটা যেহেতু এফবিআই থেকে প্রাপ্ত, এখানে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বেলা দুইটার দিকে আইনজীবী সমিতি ভবনে নিজ কক্ষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। 
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘সিমেন্স এফবিআইয়ের কাছে দোষ স্বীকার করেছে। আমরা সিঙ্গাপুরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করেছি। সিঙ্গাপুরের সেই ব্যাংকে কোকোর পাসপোর্টের একটা ফটোকপি দেওয়া হয়েছিল।’ কোকোর সাজা কার্যকর করতে হলে কী করতে হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আনিসুল হক বলেন, ‘কোকো বর্তমানে যে দেশে রয়েছেন, সেই দেশের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন চুক্তি থাকলে তা কার্যকর করতে পারে। এটা সরকারের ব্যাপার। আমি মন্তব্য করতে চাই না।’ 
দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে বলেন, দুদকের ২১ সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা করে আদালত রায় দিয়েছেন। 
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন নিজ কার্যালয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন কোকোর মামলার ত্বরিত নিষ্পত্তির কথা বলেছিলেন, তখনই আশঙ্কা হয়েছিল, ত্বরিত নিষ্পত্তি মানে ত্বরিত শাস্তি। আমাদের সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে।’ 
মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘নিম্ন আদালত যখন একটা রায় দিয়েছেন, তখন উচ্চ আদালতেই এর ফয়সালা হবে। এ মামলায় ত্রুটি আছে। তাই আশা করি, উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন কোকো।’ তিনি বলেন, ‘যখন এই মামলা উচ্চ আদালতে আসবে, তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকবে না। তখন দলীয়করণমুক্ত অবস্থায় উচ্চ আদালত ন্যায়বিচার করতে পারবেন বলে আমরা আশা করি।’ 
কোকোর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া, গোলাম মোস্তফা খান ও মাসুদ আহমেদ তালুকদার একে প্রহসনের রায় উল্লেখ করে রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। 
মামলার বিবরণ: মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, কোকোর দেওয়া আয়কর বিবরণী ও দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে সিঙ্গাপুরে তাঁর হিসাবে অর্থ জমা বা উত্তোলনের কোনো উল্লেখ নেই। সিঙ্গাপুরে জ্যাজ ট্রেডিং অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং ফারহিল কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোকোর দুটি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার সময় তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। যেসব সূত্র থেকে অর্থ জমা হয়েছে তাদের সঙ্গে কোকোর কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কও ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি অবৈধ উপায়ে এ অর্থ আয় করেন। 
এজাহারে বলা হয়েছে, ইউওবি ব্যাংকের জ্যাজের হিসাবে ২০০৫ সালের ৬ মে এবং ৩১ মে নয় লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ দশমিক ৫৭ এবং আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ দশমিক ৭৭ সিঙ্গাপুর ডলার জমা হয়। চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি থেকে এই অর্থ পাঠানো হয়। একই বছরের ১ আগস্ট নিউইয়র্ক থেকে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পাঠানো হয় আরও আট লাখ ২৯ হাজার ৭০৫ দশমিক ৮১ সিঙ্গাপুর ডলার। এর বাইরে জ্যাজের হিসাবে ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর আবারও এক লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার (তিন লাখ তিন হাজার ২৫৪ সিঙ্গাপুর ডলার) জমা হয়। ওই অর্থ জুলফিকার আলী নামের এক ব্যক্তি সিঙ্গাপুরের আরেকটি ব্যাংকের হিসাব থেকে হস্তান্তর করেন। জুলফিকার আলী টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিমেন্সের পরামর্শক। 
সিমেন্স বাংলাদেশকে তিনি রাষ্ট্রীয় মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠান টেলিটকের কাজ পাইয়ে দিতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছিলেন। টেলিটকের কাজ পেতে সিমেন্স কোকোসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের যে ঘুষ দিয়েছিল, তা প্রমাণিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আদালত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে জরিমানার রায় দেন। জরিমানার অর্থ পরিশোধও করেছে সিমেন্স। 
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, জ্যাজের হিসাব থেকে বিভিন্ন দফায় কোকোর সইয়ে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। হিসাবে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৭৫৪ দশমিক ১৫ সিঙ্গাপুর ডলার জমার বিপরীতে বিভিন্ন চেকের মাধ্যমে আট লাখ ৭২ হাজার ৮৬ দশমিক ৭৭ সিঙ্গাপুর ডলার উত্তোলন করেন কোকো। ২০০৫ সালের ২৯ জুলাই আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ দশমিক ৭৭ সিঙ্গাপুর ডলার ইসমাইল হোসেনকে দেওয়া হয়। 
জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও আয়কর ফাঁকির অভিযোগে ২২টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাটকো, নাইকো, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১২টি মামলা রয়েছে। তারেকের বিরুদ্ধে করা অর্থ পাচারের মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৭ জুলাই দিন ধার্য রয়েছে। বাকি মামলাগুলোর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
প্রথম আলো

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More